ইন্দ্রজিৎ রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইন্দ্রজিৎ রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২০

ধারাবাহিক মুক্তগদ্য ।। ইন্দ্রজিৎ রায়

মাসিক কবিতাপত্র অনলাইন ।। সংখ্যা ৬।। ০৬ অক্টোবর, ২০২০


ইন্দ্রজিৎ রায় ।। ফালতু  ডায়রি , বৈশাখ , বিশেবিষ   


( পূর্বপ্রকাশিতের  পর )


ছবিঃ হিরণ মিত্র 


বাপুজিনগর , সুলেখা এইসব অঞ্চলের গলিগুলোর  উষ্ণ  জ্যামিতি নিশ্চই  মফস্বলের  চোখে একটি  দেজা ভ্যু সৃষ্টি  করে তখন , কালোসুতোর  দেবেন  বিড়ি  অথবা  খাটালের  বুড়িয়াজী , বুধু  বলে  একটি  সুররিয়াল্  চরিত্র , এগুলো  যেন  পুরুলিয়ার  মুনসেফডাঙা , নামোপাড়ার  প্রতিরূপ ,অবশ্য গাড়িঘোড়ার  ব্যপারটা  হয়ত  মেরেকেটে  তিনভাগের এক  ভাগ । কিন্তু  রাস্তা , আলোছায়া  বস্তুত একই , সত্যি  বলতে  কি  আজকাল  এটা অসুখে  দাঁড়িয়ে  যাচ্ছে , মনে  হচ্ছে দুনিয়ার  ভেতর দিয়ে  যেন একটাই  রাস্তা গেছে ,পালটে  পালটে । রাস্তাগুলো  তোমার  চেনা । এটাই ।  উচ্ছসিত , অবাক  হবার  অপটু  অভিনয়  করতে  থাকবো ।
আমার  ভাষা ও সাহিত্যের বন্ধুদের  কাছে  একটা  শব্দ  শুনতাম  personification ...আরো  নানারকম । বোঝার চেষ্টা করতাম কী  ব্যাপারটা । বিষ  অন্ন , বিশাদ ছিলো  খিড়কির  দরজাটা ।ওতে  প্রবেশ  করে , অনেকবছর  পরে  একদিন  মেঝেতে  শুয়ে  চোখ  লেগে  গেছিলো  একদিন , চোখ  খোলার পর , আড়াআড়ি  পাঁচটা  কুড়ির  আকাশটি  দেখলাম কাদায়  পিছলে  বলের  সঙ্গে  উড়ে  যাচ্ছে , কাৎ হয়ে । অথবা কাউবয়  ছবির  মত  ঘোড়াশুদ্ধু  পড়ে  যাচ্ছে , মাঝখানে  কিছু  metaphysics  ঢুকে  পড়ে , ঘোড়ার  মত  সেদিন , শিংঘেরা  হরিণের  মতও  হয়ত বা , নিজের  হাইপার  মস্তিষ্ক নিয়ে  , কস্তুরির  সম্ভাবনার পাশে  ঘুমিয়ে  পড়লো । সুনীলবাবুর  পাম্প , হাইওয়ের  ধারে । যেন  কতবছর  ঘুমোয়নি । ঘুমের  মধ্যে ঘুণ । হাত  বাড়ালে ,ঠান্ডা  ধাতুতে লাগে , এই  আলমারি , সাবেক , পিঠোপিঠি  ভাইবোন , একদিন  অনেক  লম্বা  ছিলো  আমার  থেকে , অন্যদিন  সে  প্রায়  মাথায়  মাথায় । আজও ,এতবছর  মা হোলো  শরীর  ছেড়েছেন , আলমারিতে  এখন  অন্যদের  জিনিষই  বেশী , তবু  এই  আলমারিটার  সামনে , মেঝেতে  শুলে  চোখ  বুজে  আসে , চেনা  লাগে । এটাই । দুর্বল  চোখ , দুর্বতলতর  শ্রবণ  আমাদের কিন্তু  স্মৃতির  শীতলকুচি  থালায়  রক্তের  ছিটে , মাঝখানে  হনুমান  মন্দির  ঢুকে  আসে , অথবা  বিপজ্জনক  বাড়ির  নিচে  কালিকা  মিষ্টান্ন  ভান্ডার । এসময়ে  কলকাতায়  চলে  আসার  পর , যে  দু একবার  পুরুলিয়া  ফিরেছি , একটাই  গান  বাজতো , একে একে  নিভিছে  দেউটি ই ই ...জমি  বেশি  মানুষ  কম , এই  যে  আসমানি  জ্যামিতির  পাঠ , এও  এক  অধ্যায় । একটি  পংক্তি  খুঁজে  পাই , কখনও  একটি  ছবি । তার  সঙ্গে  মিশে  যায়  সেই  রাস্তাটা , একই  রাস্তা  যা  দুনিয়া  ভেদ করে  গেছে , ধুলোয়   গড়াগড়ি  করতে  থাকে  শরতের  বিষ ।
প্রেস , কালির  গন্ধ  এসব  ততদিনে  গা  সয়ে  গেছে , যেমন  দাদু  এবং  গহন  শৈশবের  অপসারণটাও । মানে  সয়ে  গেছে  যে  এটা নিজেকে  হয়ত  আমিই  বোঝাচ্ছি , এও  হতে  পারে । চাকরি , মাইনে  পাওয়া , কারণ  এর আগে  কেউই  আমাকে  মাসমাইনে  দেয়নি , আগের  দিন  বলছিলাম , মা  টাকা  হাতে  দেয়া  পছন্দ  করতেন  না । ফলে  যাকে  বলে  financial  acumen , সেটা  আমার  অনেক  দেরিতে  গজায় । ততদিনে  আমার  সঙ্গীরা  পাকাপোক্ত  খেলোয়াড় , পকেটে  মানিব্যাগ  রুমাল  ছাড়া  তো  ভদ্র  পুরুষ  অকল্পনীয় ,তা  আমার  ভদ্রপুরুষ  হয়ে  ওঠার  দাবি  ওখানেই  নস্যাত  হয়ে  যায় । তাই  আমি  দ্বিতিয়  তৃতীয়  পংক্তিতে  দাঁড়াতেই  পোক্ত । সেই  কবে  থেকেই ।

বাপুজিনগরের  ভেতরের  সরু  চওড়া  গলিগুলো  দিয়ে  ঘুরতে  ঘুরতে  পেছনের  দিকের  পাড়াগুলোতেও  ক্রমশ  যোজিত  হতে  থাকি , মধুক্ষরা  মিষ্টির  দোকান  এবং  ক্রমশ  রাণিকুঠি  যাবার  পথে  বারোভুত  অথবা  দ্বাদশ অবতারের  মেলা  আমাকে  গ্রাস  করে  ফেলে , এতটাই , যে  আমার  পরবর্তীর  অনেক  অনেক  গাঁট  থেকে  যায়  , এখানে , সেটা  অন্য  প্রসঙ্গ । তবে  এই  এলাকা  অনন্য  স্মৃতির  সঙ্গে  কিছু  মানুষ  জড়িয়ে  আছেন , থাকবেনও । তারা  বন্ধু , অগ্রজপ্রতিম কখনও  অটোচালক । তাঁদের  নাম  নিয়ে  অকারণ ভারি  করতে  চাই  না , তবে  আজ  হঠাৎই  তাপস , কবি  তাপস দততো  কে  না  বললে  এই  লেখাটি  কোথাও  সুর  হারাবে , প্রয়োজনীয়তাও  কিছুটা , তখন  তাপস  লিখছে  look  through an ugly glass , না  এই  শিরোনামটা  বাংলাতেই  ছিলো  মূল  কবিতাটিতে , মনে  পড়ছে  ধারাপাত , মনে  পড়ছে  সাহিত্য তৃষা এমন  অনেক  অনেক  , সেই  বিজ্ঞাপনের  মত , এ  স্বাদের  ভাগ  হবে না , সুমন  রায়  এবং  উলটো  গণেশ , এ বলে  শেষ  হবে  না । বারোভুতের  মেলা  আমার  পুরুলিয়ার  রাসমেলা  হারানোর  কষ্ট  লাঘব  করে  কিছুটা , এই  মেলার  মাঠ , গহিন  কলোনি  অঞ্চল ও  তার  নানান  জরির কাজ  আমার  জগতে  ভরে  ওঠে , লালকা  পাড়ার  বর্ষাঘেরা  ঘন  গাছালি  আমার  নগরবাসের  ক্লেদ  মুছে  দিতো , অনেকটা , এমন  অনেক  দিন  হয়েছে , আজও  হয় , সম্পুর্ণ  উদ্দেশ্যহীন , রিজেন্ট  এস্টেটের ভেতরের  রাস্তাগুলোতে  সাইকেল  নিয়ে  ঘুরে  বেড়িয়েছি , পায়ে  পায়ে  চেনা  মানুষ , চেনা  হঠাৎ  এক  ছোট্ট  ঘুর্ণী  বাতাস । কটা  শুকনো  পাতা , বিড়ির  খালি  প্যাকেট , কয়েকপাক  ঘুরে , আবার  সব  স্থির । আমার  ঠাকুরমার  চেহারায়  সারদা  মা'র  আদল  ছিলো , বাবাকে  মেলা  থেকে  সারদা  মা'র  ছবি  দিয়ে  বলেছিলাম , রেখে  দাও , বাবা  অনেক্ষণ  তাকিয়ে  ছিলেন  ছবিটার  দিকে , যেভাবে  জীবনে  প্রথম  চাকরির  মাইনে  পেয়ে  উল্টেপাল্টে  দেখেছিলাম  অনেক্ষণ । বুক  ভেঙ্গে  কান্না  পেয়েছিলো ।জানিনা  কেন ।সবাই  তো  খুশি  হন  শুনেছি । বুঝেছিলাম , মা  কেন  চাইতো  না  আমাকে  কেউ  টাকা  হাতে  দিক । হস্তি  মা  ছিলেন  তো , আগলে  রাখতে  চাইতেন । ধম্মপদ  গ্রন্থে  যেমন , বুদ্ধ  বলছেন হস্তি  সম  ,একাকী  সঞ্চর  - মা ও  খুব  একা  ছিলেন । খুব । সবার  মাঝে থেকেও ...

শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২০

ধারাবাহিক মুক্তগদ্য ।। ইন্দ্রজিৎ রায়ঃ ফালতু ডায়রি,বৈশাখ, বিশেবিষ

মাসিক কবিতাপত্র সাপ্তাহিক অনলাইন ।। সংখ্যা ৪।। ২৯ আগষ্ট, ২০২০


ধারাবাহিক মুক্তগদ্য
ইন্দ্রজিৎ রায়।। ফালতু ডায়রি,বৈশাখ, বিশেবিষ 




( পূর্বপ্রকাশিতের পর )

প্রাপ্তবয়স্কদের অনেক সময়ে ডায়াপারের প্রয়োজন হয় ।কবে আবিষ্কার হয়েছিলো জানা নেই কিন্তু আমার মাতামহ শ্রীযুক্ত শচীন্দ্রনাথ রায় মহাশয় কিন্তু সেটা , মানে ডায়াপার , পাননি । আমিই সম্ভবত এই অনিয়ন্ত্রিত জল কাচানোর সবথেকে কাছে ছিলাম । রাতের পর রাত , দাদু সারারাত জেগে থাকতেন , বাথরুম যাওয়া আসা করতেন অজস্রবার , কারণ তাঁর মনে হোতো পুরোটা হয়ত হয়নি , তাই আবার । কোথায় তখন ডায়াপার , তখন তো লোকজন দাদুকে কলকাতার এক মনোবিদের কাছে দেখাবে বলে নিয়ে গেলেন । বড় , বুনিয়াদী বংশ ,নানা মুনি , তা মনোবিদ কী করলেন কে জানে , দাদুর যেটুকু ব্যালান্স ছিলো ,তা লুপ্ত হোলো । প্রকৃত অর্থে , বস্ত্রের ঝামেলা তিনি বাদ দিতেন , মাঝে মাঝে , কিন্তু পুরুলিয়ার বিরাট বাগানবাড়িতে , রাতজাগা দাদুকে আমার অন্তত প্রকৃতিস্থই মনে হোতো , অনেক কথা হোতো , আমিও জেগে থাকতাম , কাল কাউকে কাউকে বিষের পরিবর্তে স্মৃতিভার দিয়ে থাকেন , প্রখরতর স্মৃতি জংধরা ক্ষুধার্ত করাতের মত পাশবালিশের পাশে রাখা হতে থাকে , কমা কমা দাও , দম নেন কথক একটু , কিন্তু যেদিন ভোররাতে , জিজ্ঞেস করলেন আমাকে ,আচ্ছা ,আমার গুরুদেবের নামটা কী যেন ,সেদিন বুঝলাম হয়ত সব ঠিক নেই তেমন , ওরকম সময়েই একদিন বাগানের তালগাছটাতে , শকুন দেখেছিলাম , একবারই , কেমন মুখটা উপরে তুলে , বসেছিলো , ভুলতে পারিনা । মেটে রঙের চিল আসতো বহু , মানভূমের রোদে পুড়ে হয়ত অমন রং , আর তিতিরের মত দেখতে কিছু । মাঝেমাঝেই কালোজিরে কিনে এনে দাদু কেস খেতেন হেঁসেলে , আবার কালোজিরে ? সত্যি বলতে কি আমারও চোখে ওই কালো নক্ষত্রখচিত রোদে পোড়া , হালকা মেটে অথবা সাদা রঙের আসমান প্রতিভাত হয়ে থেকে যেতো , সাদা সাদা মাঠ দেখতাম স্বপ্নে , তাতে কালোজিরে ছড়ানো , ছোট্ট দুটো ডানায় উড়ে উড়ে দাদু কুড়োচ্ছেন সেগুলো , ভোর চারটে দাদুর সঙ্গে পুকুরে স্নান করতে যাচ্ছি , নতুন ছট্ পুজোর গামছার মাধুর্য সকলেই বোঝে । সাদা মাঠের মাঝে নীলচে সবুজ পুকুর , তালা দিতে কোনোদিন মনে থাকে না আমার । থানার বড়বাবু ছিলেন দাদু । বাসায় ওয়েব্লি এন্ড স্কট্ রাইফেল । কিন্তু বেলাইনের পুলিস , গ্রামের কেউ পুকুরের মাছ দিতে এলেও পয়সা দিতে চান । লোক অবাক , এ আবার কী পুলিস ! পয়সা দিতে চায় । সেই ভোররাত , আমি দাদুকে মনে করালাম , কাঠিয়া বাবা । ও হ্যাঁ , শুনে কেমন চুপ করে গেলেন কিছুক্ষণ , বললেন , শুয়ে পড়ো । কলেজ আছে ।আবার সেই ছবি , আধোঘুমে , একটা সাদা ফলের ভেতর দাদু কোথায় যাচ্ছে , বিখ্যাত বাংলা সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে । বড়বাবু ।সাদার ওপর ছিটছিট কালো , দাদুর কেনা সমস্ত কালোজিরে , অদ্ভুত পোলকা ডটের মাঠ , ফলের গভীরে , পরে চাক্ষুস দেখেছি ফলটা , নাম ড্রাগনফ্রুট্ , গোলাপী সাপের দুটো চারটে ফণা আবৃত ফিসফিসে দর্শন । শুলেই । একটা অন্য রামায়ণ দাদু বলতেন , দোকানে ,একই ইলিশ মাছ লক্ষণ ও রাবণের বোনের পছন্দ হয়েছে , কে সেই মাছটা নিয়ে বাড়ি যাবে , সেই নিয়ে বিবাদ ও যাবতীয় ক্যাচালের শুরু , যা আমরা রামায়ণ নামে পড়ি । অথবা এটা যে পান্ডবদের গরু যদি দুর্যোধনের বেগুনখেতে না ঢুকতো , মহাভারত লেখা হোতো না । এখানেই শেষ নয় , মুরগি লড়াই , লাল কাপড় দিয়ে ষাঁড় কে ক্রুদ্ধ করে তোলার খেলা , দাদু আর আমি একটা নিঃসঙ্গ টিম , চিরকালীন । হনুমানজি কে খুব পছন্দ করতেন , সেই থেকে উনিও আমার সব আকামের সঙ্গী, তবে কি , হনুমানজী কিন্তু বাম্পার । ওঁর সঙ্গে একটা যাকে বলে nexus ইংরেজিতে , সেটা অনুভব করি আজকাল । এর সঙ্গে কোনও ধর্মীয় ব্যপার জড়িত নেই তেমন । কী আছে এ বলা দুষ্কর , তবে অনেক অন্ধকারে দেখেছি মনে পড়ে হনুমানজির সেই পুকুরপাড়ের বাড়ি । ওই চাতালটা খুব চেনা যেন । খুব । ওখানে আজকে যারা বসেন গিয়ে তাদেরও চেনা লাগে । মনে পড়ে বর্ষার ধানক্ষেত জলাশয় , কালভার্টের তলায় খলবল করছে অন্যদেশের চ্যাং মাগুর , ওপর থেকে , শুয়ে মাছ দেখতে দেখতে কখন চোখ লেগে গেছে । বৃষ্টি থেমে গেছে কখন । জ্যোতি মাহাতো , দাদুর ভাগচাষী , সে গরুর গাড়ি করে পৌঁছে দিয়েছে বাড়ি । কিন্তু ওই কালভার্টের , এখানকার ভাষায় পোলের তলার মাছগুলো , তাদের উচ্ছাস , শহরবাসের অনেক ভার কাটিয়ে দেয় আজও ।দাদুর সেই মনোবিদ একটি সোনারূপোর দোকানের বিজ্ঞাপন করতেন । হোর্ডিংয়ে তাঁর ছবি । ঢাকুরিয়া ব্রিজে দাঁড়িয়ে দেখছি , অবাক হয়ে । একসময় তিনি সরে গিয়ে ফুটে উঠছে এক পয়সাও ঘুষ না খাওয়া , ডি.এস.পি শচীন রায় র মুখ , চোখে সংকট , ডায়াপার আসেনি বাজারে তখনও , শুধু মনে হচ্ছে এই বোধহয় আরেকটু হয়ে গেলো প্যান্টে । আবার বাথরুম , আবার সেই বিস্কুটের শহরে , বিস্কুটের বাড়িঘর জানলা , আজ আবহাওয়া পূর্বাভাস , বলছে নিরানব্বই শতাংশ বর্ষা , দাদুর স্মৃতি আবছা , তালগাছে শকুনের ছায়া , আমি জেগে আছি , দাদু আজকাল ভোর তিনটে থেকে ঠাকুরঘরে বসে থাকে । বৃষ্টি এলে ? এই বিস্কুটের ঘরবাড়ি কী হবে ?বাঁচানো যাবে ? দাদু কি ভয় পেতো কাউকে ? কিছু কে ? জপ ধ্যান মনে ছিলো দেখেছি কিছুটা ।আর সব আবছা হয়ে আসছে । এই দাদু ছোট আমাকে অমন গল্প বলতো ! দলমা পাহাড়ের নিচে যে বাড়ি , সেখানে কি আজও স্মৃতিভ্রংশ ঘুঘু , মেটে রং আকাশ ঘিরে ধরছে , সন্ধ্যাশেষে কালো নক্ষত্র ফুটে আছে স্থির , ইটভাটা শ্রমিকদের পাড়া এদিকে , দাদুর সঙ্গে আমার কেমন শেষদিকটা ছিন্ন হয়ে গেলো । কলকাতা , পাটনা ঘুরে ওঁর কী চিকিৎসা হোলো জানা নেই , কিন্তু আমি পেলাম না শেষটা । দাদু চলে যাবার আগে একটা দিন খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছিলেন শুনেছি । খুব পুরুলিয়া যেতে চাইতেন । আমিও চাই যেমন । কিন্তু । কিন্তু । অশোকা গোয়ালিনী কে ছিলেন , আমি জানিনা । দাদু জানতেন । এক সন্ন্যাসী ডাকাতের সত্যি ঘটনা বলতেন খুব । সেটা , অন্যদিন বলা যাবে । 

( ক্রমশ ) 


শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২০

ধারাবাহিক মুক্তগদ্য ।। ইন্দ্রজিৎ রায়

মাসিক কবিতাপত্র সাপ্তাহিক অনলাইন ।। সংখ্যা ৩।। ২২ আগষ্ট, ২০২০




ছবিঃ হিরণ মিত্র

ইন্দ্রজিৎ রায় ।। ফালতু ডায়রি , বৈশাখ ,বিশেবিষ 



( পূর্বপ্রকাশিতের পর ) 


ময়লা ফেলার যে জায়গা তাকে সবাই ভ্যাট্ বলে । কদিন ধরে রাত করে শুই , উঠতে পারি না , সকালে ময়লা গাড়ি যখন বাঁশি বাজাচ্ছে আপ্রাণে ,উঠতে পারি না ।বেলার দিকে সব ময়লা নিয়ে ভ্যাটে ফেলতে যাই আর তখন সকলের মতই পূর্ণদাস বাউলের কন্ঠে সেই গান ,ক্যাসেটে শোনা , সেই গান সবার কানে বাজে । কেউ কেউ শুনেও না শোনার ভাণ করে , গুরু আমার মনের ময়লা , যাবে কি করে ... মনে পড়লো গানটা ? আজও পড়লো । রাস্তাটা সুনসান , গতকালই লকডাউন গেছে , আজও তার ঘোর আছে , ভ্যাটের ঠিক সামনে , একটি পাঁচরঙা বড় ছাতার নিচে বসে আছে , একলা লটারি -বালক , সকাল থেকে কেউই আসে নি সম্ভবত , লটারি খেলতে ।বসে আছে ,ছেলেটি , মুখে ভাইরাস মাস্ক , ঘুরে ঘুরে বৃষ্টি হচ্ছে আজ , ময়লা ফেলে রোজই চলে যাই , দ্রুত পায়ে , যেন কোনো এক মুহুর্তে আমার ফেলে যাওয়া সমস্ত ময়লা , উড়ে ফিরে আসবে আমারই হাতে , আধিভৌত বয়া মাঝগঙ্গায় ,হঠাৎ নড়ে ওঠার মত , কিন্তু আজ , তবুও ,থমকে গেলাম । অনেকদিন পর এই পাড়াটার দিকে তাকিয়ে বোঝলাম যে কর্মব্যাস্ত - এই শব্দটির প্রকৃত ব্যঞ্জনাটি কী । নিজেকে ট্যুরিষ্ট মনে হোলো , এই পাড়ায় আছি এতবছর ! এসব কবে হোলো ! কতদিন দেখিইনি তাকিয়ে ! কলোনির পুরাণ যে টিন কাঠের বাড়ি , সেগুলো চলে গিয়ে এই স্বপ্নালু-আলু নব্য বসতি , বেশ লাগলো রঙীন ফ্ল্যাটবাড়িগুলো . ঘাটবাঁধানো পুকুর , যেখানে মা'র অস্থি বিসর্জন দিয়েছিলাম । বাবাকে মিথ্যে বলে , যে বাবুঘাটে গঙ্গায় দিয়েছি । বাড়ির পাশের পুকুরেই রেখে দিয়েছিলাম , যেন কাছেই রইলো , এমনটা ভেবে । ওই আর কি , তো দুবছর আগেও , ঘাট ছিলো না এমন । এখন হয়েছে । অবাক চোখে পাড়া ,পুকুর দেখে , তিনতলায় ওঠা ইস্তক ওই রাস্তা, ময়লার ভ্যাট ও লটারিযোদ্ধার এই ত্রিমাত্রিক আয়না ও সম্পদ । রাস্তা মানেই সম্পদ , নিঃস্ব মানুষের , তার ময়লা , তেলচিটে হাত পা রাখার একমাত্র জায়গা যে সমস্ত ঘরছাড়াদের নিয়ে নেবে ,নিতেই থাকবে বছর বছর , ঋতু ঘুরবে , শুধু ঘুরবে না প্রারব্ধ , বাবা কে নিয়ে , গাড়ি রিজার্ভ করে দেখাতে যাবো আশ্রম , বৃষ্টি হবে ঘুরেফিরে , সাঁঈবাবা শিরদিওয়ালে , স্বপ্নে দেখবে সেই ফেট্টি মাথায় পাগল , বলছে বাড়ি যা বাড়ি যা ,আজ বাস নেই ,বাস বন্ধ , এসব কেন ভাবছি ভ্যাটে ময়লা ফেলতে গিয়ে , লটারিবালকটির মুখ মনে পড়ছে , পয়সাটা বোঝা হোলো না তেমন , আসলে দুটো ব্যপার ছিলো । এক , মা বাচ্চাদের হাতে টাকা দেবার বিরুদ্ধে ছিলেন , আর ক্লাস সেভেনে বাবার ঐ কথাটা , রাজা কখনও পার্স পকেটে নিয়ে বেড়ায় না , বলতেন তোমার কী লাগবে বলো , পারলে এনে দেবো । ব্যাস ।ওই যে , আদি গুরু মাতাপিতা শেষের গুরু বাঁশ - ওই পার্স ছেড়ে গেলো । আজও , কত কত দামী পার্স , আলমারিতে পড়ে । নতুন । আর পদার্থবিদ্যা পড়তে গিয়ে হাতঘড়িটি গেলো । কত হাতঘড়ি পড়ে আছে । এই রাস্তার ওপর এত কিছু । ছেড়ে যাওয়া । পার্স ঘড়ি ক্যালেন্ডার । তবু পয়সা সেই পকেটে নিয়ে ঘুরতেই হোলো । এর থেকে মুক্তি পাইনি । মা যদি ব্যবস্থা করতে পারতো যে বড় হয়েও পয়সা ঘাঁটতে হবে না । যদি করতো । চল্লিশ বছরের জন্মদিনে সেই বাবা দামী একটা পার্স দিলেন , সেই বিস্ময়টা ,সেকি তুমি সত্যিই ...পার্স রাখোনা ? বাবা ভাবতে পারেননি ওই ছোটবেলার কথাটা আমি এত মন দিয়ে শুনবো ।রাস্তার পাগলদের খুব মন দিয়ে দেখি , তাদের উভলিঙ্গতা , কুমিরের চোয়ালের ভেতর চাদর কম্বল প্লাটিক প্যাকেটের , আর্দ্র কলোনি দেখি , মেয়ে পাগলদের সম্ভাব্য অতীতগুলো রাস্তায় ঘষে মসৃণ ,মাঝেমাঝে এই পাড়া শুধু না , এই পুরো বসতটাই , শহরটাও অচেনা লাগে । এটাই হয়তো চেনা অচেনার জাফরি , যার আলো আঁধার তিতিরের পোষা বেড়াল আঁধারমাণিকের মত , বৃষ্টির বাগানে যে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় , মাছের লোভ দেখিয়ে যাকে ফেরত আনা যায়না ।ঘন্টা দেড়েক পর বৃষ্টি থামলো । ছাতে উঠি না , অনেকদিন ,রাত করে , আগে রাতে ওপরেই থাকতাম অনেক । ছাতের আলোটা কেটে গেছে আজ অনেকমাস , ওপরে ঈষত আলোকিত আকাশে , নারকেল পাতাগুলো হাওয়ায় মুছিয়ে দিচ্ছে আকাশ । একটু গা টা ছমছম করে উঠলো যেন , শেষে কি ভুতে পেলো আমাকে ।ভুতে পায় কাউকে ।নাকি নিজেকেই খুঁজে পাই , অন্ধকারে , আর বুঝি চটি পরা পা দুইটো জলে ডুবে যাচ্ছে । ছাতে জল জমেছে এত । লকডাউনের নিস্তব্ধতায় কোথায় ব্যাঙ ডাকছে শব্দ আসে । বসে হাতড়ে হাতড় ঝাঁঝরি বসানো ড্রেন খুঁজে পাই । দু চারটে কাঠিকুটো , আর , চুল ।লম্বা , দলাপাকানো চুল । এত চুল ছাতে , কার চুল । ছাতে তো তেমন ...আসেই না কেউ । আঙুলে জড়িয়ে চুলগুলো তুলে দেখার চেষ্টা করতে গিয়ে মনে পড়ে অত বড় ছাতে আমি একা , রাত , আঙুলে একদলা চুল । ওটা সরিয়ে নেওয়াতে কলকল শব্দে জল ড্রেনে ঢুকছে । মেঘ সরে একছটাক আলোয় জল দৌড়ে যাচ্ছে । পালাচ্ছে । রহস্যের চুল সরিয়ে সরিয়ে । আমি পারছি না । পালাতে । 

(ক্রমশ ) 





শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০

ধারাবাহিক মুক্তগদ্য ।। ইন্দ্রজিৎ রায়

মাসিক কবিতাপত্র সাপ্তাহিক অনলাইন ।। সংখ্যা ২।। ১৫ আগষ্ট, ২০২০




ইন্দ্রজিৎ রায়।। ফালতু ডায়রি, বৈশাখ, বিশেবিষ


হঁসদেও নদী পেরিয়ে আকাশখাওয়া চিমনিগুলো , ডোরাকাটা চিমনি ,এখানে নদী আটকে সেই জল কারখানার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে ,তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে । দিদা বলতো ছাগলের লড়াই ,আনুষ্ঠানিক বাতি ,চোং লাগিয়ে,লোক ডেকে শেষে এই ! নদী পেরিয়ে বিদেশের পোস্টকার্ডের মত ঝকঝকে নগরপ্রতিমা , যা ঠিক এখানকার নয়,এগুলো সরকারের আমদানি ।এই সরকার লোকটা কে বুঝতে সত্তর বছর লাগলো আমাদের ।আজ ও সত্যি জানিনা । জানানার মত। মর্দানা আর জানানা ।দুরকম দেশ,কাল । কারখানা সংলগ্ন বাড়িঘর গুলোতে আমার বাবা মা থাকতেন, কোন পাশাখেলার চালে আমার দিদাও গিয়ে পৌঁছেছিলেন । সেটা প্রথমে খুব স্বাভাবিক মনে হলেও , পরে বোঝা যায় এর আধিভৌতিক দিকগুলো । নড়াইল সাবডিভিশন কি খুলনা ? দিদার বাবার নাম ছিলো পুলিনবিহারি । রাজরোগ ।বাবা চলে যান ।ঘুরতে ঘুরতে , থিতু কাকে বলে ? কেউ কি হয় । এই যশোর খুলনা ঝিনাইদহ আমি গেছি ।কিন্তু ফিরে এসে বলার কাউকে পাইনি ,কারণ , ততদিনে ...কেন দিদার কথা বলতে হবে । হনুমানজীর কথা ছেড়ে ,কেন বলতে এলাম সেটা হয়ত ঐ বাল্যকালের গাধা পেটাপিটি ।টালিভাঙ্গা টুকরোর একটা স্তুপ বানিয়ে যেন দূর থেকে রবারের বল ছুঁড়ে তা ভেঙ্গে ফেলা ,একটা চিৎকার ওঠে ,হো ও ও ও ও , থেমে যায় আবার । পুনরায় ঝিঁঝি ও পাহাড়ি গুবরে পোকা দখল নেয় নীরবতার । নিশুত রাতে পাহাড়ি গুবরে দিক হারিয়ে ঠং করে ল্যাম্পপোস্টে লাগে এসে । আবার এই চাট্টান ছত্তিসগড় ঝিমোতে থাকে ।
খুব ভোরে উঠে আশপাশের অনেক রাস্তাঘাট বুঝে নেয় দিদা , প্রবল পাঠাভ্যাস ছিলো , শেষ বয়সেও ছানি চোখে , বইয়ের মধ্যে ঢুকে যেতে দেখেছি ,একেকসময়ে ভাবতাম কোনও বইয়ের মধ্যেই ঢুকে পাতার মত জালজাল ,অশ্বত্থের মত হয়ে আছে কোনও মানুষ ,বই খুললে হয়ত বেরিয়ে আসতে পারে , এসব ভাবতাম । অত বড় কারখানাতে যা হয় , তা কিন্তু আদতে মাছের তেলে মাছ ভাজা ,শিল্প মানে কল কারখানা অথবা লেখাছবি শিল্প , সবই কিন্তু কঁ কাঁচামাল এখানেই পাওয়া । দুনিয়াতে ।কাঁচামাল বানানোর খেমতা নেই কারো । দিদা বলতো , গোলকের পেটের ভেতরেই তেল , সেই তেলে গাড়ি প্লেন চালিয়ে কত ফুটানি দেখ ।এক ফোঁটা পেট্রল বানাতে পারবি ? না ।কেন? এত নপর চপর কথা ,পেট্রল বানা কেনে ! বানাতে সময় লাগবে ।কাল । মহাকাল ঢুকে সব পচিয়ে তবে তো তেল , অত সোজা ।এই যে হঁসদেও নদীর ওপরে বাঁধ , মালগাড়ি ভরতি কয়লা বাষ্প হচ্ছে , সেই ক্ষিপ্ত বাষ্প ঠেলে ঘোরাচ্ছে টারবাইন , আর এখানকার স্থানীয় সফল মানুষ ,তাদের মজদুর ভাই বলে ডেকে,তাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে কিছু শহুরে শিল্পী দিব্যি বেঁচে আছে, এও এক বুকভাঙ্গা আখ্যান । এখানে দাঁড়িয়ে দিদা ছাড়াও আরেকজন কে ভাবি ।না তিনি আপনাদের ভাষায় সেলেব্ নন ,তবে ঐ মজদুর ভাইদের কাছে , নিশ্চই । শঙ্কর গুহনিয়োগি । ব্যাস । নামটাই যথেষ্ট ।বাকিটা সংস্থাপক , অধ্যাপক ,ব্যবস্থাপক এঁরা বলবেন ।আমাদের কাজ তো বলা না ,হাতিঘাসের এপার ওপার , টকটকে লাল বৃষ্টিধোয়া একটি টালির দিকে তাকিয়ে আনমনা হতে পারেন বন্ধুরা আজও , হাতিঘাসের ভেতরে টালি ।কী রূপ ! মনে পড়ে দশ বিশটা বছর , দিদার হাসপাতাল বাস । গভীর কোমা । দেয়ালা ।কাউকে চিনতে পারছে না । পেচ্ছাপ বন্ধ ।আমি দৌড়ে এসেছি ।দিদা আ , স্পষ্ট গলায় উত্তর দিলো দিদা ।তিনদিন পর ।ডাক্তার অবাক ।আসলে ডাক্তারি শাস্ত্রে কি বাৎসল্য পড়ায় ? পঞ্চরসের ভিয়ান ।পড়ায় ? জানি না । পরের দিনও তাই ।অবস্থা খারাপের দিকে ।সাড়া নেই । আমাকে ডাক্তার বললেন , আপনি ডাকুন । সাড়া দিলো দিদা ।যেন পুরুলিয়ার মামাবাড়ির অতলান্ত পাতকুয়ো থেকে গলাটা উঠে এলো , সোনাই ই ই , হাতটা এগোতে আঙুলটা চেপে ধরলো দিদা , আহা বাৎসল্য মহারস কেন ! কী খাবে দিদা ? বলো ,বলো কী খাবে ....এক মুহুর্তের নীরবতা , দহী ভাত খাবো ...আমি দৌড়ে বেরোলাম বাবার স্কুটারটা নিয়ে ,এতক্ষণে ভাত হয়ে গেছে , কিন্তু ,কিন্তু যখন ফিরলাম , দিদা , ওই আর কি । দইভাত টা থেকেই গেলো । আমার প্রিয় একটি পাঞ্জাবি গান , " বিনা হুকম্ দে অন্দর না ,যায়ে রোটি.." , হুকুম ছিলো না ,দই ভাত ,কিন্তু কোমার ভেতরেও শুধু বাৎসল্যের জোরে ,নাতির ডাকে , মৃত্যুর হাত ছাড়িয়ে , সাড়া দেওয়া ।মনে থাকে ।
এরপরেও থাকে আমার ডোমজন্ম । ডোমরাজা । ওখানে শ্মশাণ ছিলোনা, নতুন বসতি তো , বিলাসপুর যেতো সবাই ।আমি রাজি হইনি । বললাম যা হবার ,এখানেই হবে । মানুষজন জুটে গেলেন । কিন্তু হাসপাতাল থেকে দিদা ,মানে দিদার শরীর চলে এলো সন্ধেবেলা ।সারারাত , ড্রয়িং রুমে শুয়ে থাকলেন ।পরদিন , হঁসদেও নদীর ধারে ,কাঠ যোগাড় করে,চিতা বানিয়ে যখন কাজ হচ্ছে , আমার , আশ্চর্যভাবে মনে পড়ছে , অক্ষয় মালবেরি র কথা , দিদা মিশে যাচ্ছে ,হঁসদেও নদীতে ,ছত্তিসগড়ের আকাশে , অক্ষয় মালবেরির দাদুর মত , আমি কিরকম শিক্ষানবিশ ডোমের মত ,হাতে একটা নদীর পাথর নিয়ে , চিতার অনতিদূরে , ঠিক যকৃতের মত দেখতে ,নদীর পালিশ করা পাথর , যা আমাকে ভুলতে দেয় না কিভাবে কোমার গভীর থেকে অত স্পষ্ট সাড়া দিতে পারে জান ।
প্রাণ কি পাখি ? সত্যিই ? ডোমরাজা । গা শিরশির করে । হঠাৎ হঠাৎ । ব্রয়লার হিন্দি ভাষা জানে ,অথবা মৈথিলী ,অবধী ...এটা অনেক আগে একটা লেখার শিরোনাম ছিলো ,মাংসের ভেতরে যেমন কুচকুচে হাড় খুঁজে পাওয়ার একটা এলানো ইচ্ছে থাকে ,সকাল থেকে সাইকেলে গড়াতে গড়াতে যে ব্রয়লারের চিৎকার গুলো শুনি ,ওটা বাংলা হতে পারে না । হিন্দি নাকি ? তাই হবে , ছত্তিসগড়ের ঠেট হিন্দি ,গা শিরশির করে ওঠে .....
(ক্রমশ )

বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২০

তিনটি কবিতা/ইন্দ্রজিৎ রায়


ইন্দ্রজিৎ রায়।।তিনটি কবিতা


কলেজ বিড়ি -১

একটা দুটো চাদর থাকে , কিছুতেই

পুরোনো হয়না ,একজীবন চলে

যায় , গদাইয়ের দোকানের মত ,

রোজই গরম রসের জন্য

সমাগম । কি জানো , শুধু কিছু

চকিত বাতাস এসে , রান্নাঘরটা

ভেঙ্গে দিয়ে যায় । এক ঝুড়ি

বাসনকোসন , বালতি ঘুঙুর , ভাঙ্গা

একতারা , ছত্রাখান । কালো জমজমি চাদর , তারা বসানো , তারায় তারায় , দিদার যশোর খুলনা , আমার ছোট্ট মা খাবার

টেবিলে , চড়ে বসে আছে , বাহাদুর

ভাত লাও , হরে কৃষ্ণ বলছে

শাহী কাকাতুয়া ।



রান্নাঘর ভেঙ্গে দেয় কাল । বাকিটা

আমরা দেখে নেবো । চাদর , চুমকি

বসানো , তারার শহরে মাতামহিদের ছানিকাটা চশমা ,

ভাঙ্গা উনুনে , শেয়ালনির ঘরবাড়ি ।।



কলেজ বিড়ি ২

বিকেল শেষে হাত পা ঢুকেপড়তে চায় মুখের ভেতর । তৃতীয়বিশ্বের হাত চিবাতে থাকি,সজিনাডাঁটার অভ্যাসে । সরকারি চাকরি করা , আপোষহীন বাজনদার , তাদের কোলাহল শুনি । সম্প্রতি ,কটা ঝিঁঝিপোকা এবাড়িতে ,শেল্টার্ নিয়েছে । গভীর রাতে ,নিদ্রিত পাড়ার কাঁধে বসে,দিনের শেষ বিড়িটা ধরায় ঝিঁঝি । নাকি ওটা অন্য কেউ ,বারান্দার অন্ধকারে?


ঝিঁঝিপোকা কি বিড়িও টানে আজকাল


নেশার পরে

হাত ধরে টানে অন্ধকারের গলিগুলো পৌষে । মেলার ঠাকুর দেখি বাইরে , চাতালে বসে । ছিলাম আছে । লালচে সাফি , ছেদক যন্তর । যা ছেদন করে দেবে এ দোকানপাট , আয়নার গলি । এদিকটা কেমন যেন মারোয়াড়ি গন্ধ , ঘী আর চাট মশলা । মেলার ঠাকুর হ্যাংওভার মুক্ত । ওসব পেঁচো মাতালদের হয় । ঠাকুরের সব তখন তখন । গরম । রিহ্যাব্ সেন্টারের গলি থেকে , ঝকঝকে সাইকেল নিয়ে আপুয়া বেরিয়ে কোথায় যেন যায় । প্রায়ই দেখি ,আইসক্রীম গলছে , লালশালু মোড়া কুলফি গাড়ি থেকে ,গাঢ় সবুজ বল হাতে দিচ্ছে রামপুকার । কোথা বাড়ি ? মুঙ্গের জিলা । পৌষের গলি টানে , মা'কে বলা যত নেশাজনিত মিথ্যে , হাতে খইনির মত ডলছি আজ । চিট আঠা এত , মা নেই , মিথ্যেগুলো ,রয়ে গেছে , মেলার ঠাকুরের কাছে আসি , কান্না পায় হঠাৎ ,সারদা মা'র একটা ছবি হাতে দিয়ে বলেন , লে জা বেটা ।



পেঁচো দের সঙ্গে আর কথা হয়না তেমন । খর্বকায় মন্দির থেকে গডজিলার মত হরিনাম , পথ হারানো মথের মত , ধাক্কা লাগে দেয়াল থেকে দেয়ালে ।।